ফটিকছড়ির ছাগলকান্ড:

যে প্রকল্প জীবন বদলে দেওয়ার, সেটি শুধু কাগজেই

সালাহউদ্দিন জিকু

মায়ালক্ষ্মী ত্রিপুরা যেদিন ছাগলটি পেলেন, সেদিন মনে হয়েছিল একটু হলেও সংসারে সুবাতাস আসবে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু এক সপ্তাহও যেতে না যেতে ছাগলটি মরে গেল। পাশের বাড়ির ললিন্দ্র ত্রিপুরার বেলায়ও একই ঘটনা। ফটিকছড়ির দাঁতমারা ইউনিয়নের সোনারখীল আর পেলারখীলে একের পর এক ছাগল মরার এই গল্প শুনতে শুনতে স্পষ্ট হয়ে উঠল একটি প্রশ্ন- সরকারি নথিতে যে সুস্থ-সবল ছাগল বিতরণের কথা লেখা আছে, সেই ছাগল আসলে কেমন ছিল?

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নেওয়া সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবতা খুঁজতে গিয়ে যা মিলল, তা উদ্বেগজনক।

নথিতে সই আছে, সই করেননি উপকারভোগীরা;

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই পর্যায়ে মোট ২০০ উপকারভোগীর মধ্যে ৪০০টি ছাগল, খাদ্য, ফ্লোর ম্যাট, সিআই শিট ও কংক্রিট পিলার বিতরণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে প্রতিজন পেয়েছেন দুটি ছাগল, ২৫ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট ও আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিতরণ তালিকায় যোগ হয়েছে সিআই শিট ও কংক্রিট পিলার।

মাস্টাররোলে উপকারভোগীদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু ২২ থেকে ২৫ আগস্ট সরেজমিনে যাচাইয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

দাঁতমারার সোনারখীল ও পেলারখীল, নারায়ণহাটের নেপচুন এবং বাগানবাজারের রামগড় চা-বাগান এলাকায় মায়ালক্ষ্মী ত্রিপুরা, ললিন্দ্র ত্রিপুরা, কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরাসহ ১৩ জন উপকারভোগী জানান, মাস্টাররোলে তাঁদের স্বাক্ষর থাকলেও তাঁরা কখনো স্বাক্ষর করেননি। নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সঠিক থাকলেও স্বাক্ষর তাঁদের নয়। ছাগল পেলেও আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তা তারা পাননি।

৩০টি ছাগলের ২৭টিই মারা গেছে;

দ্বিতীয় পর্যায়ে যাচাই করা মায়ালক্ষ্মী ত্রিপুরা, ললিন্দ্র ত্রিপুরাসহ ১৫ জন উপকারভোগীর ৩০টি ছাগলের মধ্যে ২৭টিই মারা গেছে। এর মধ্যে ১২ জনের দুটি করে এবং তিনজনের একটি করে ছাগল প্রাণ হারিয়েছে। অনেকে জানিয়েছেন, ছাগলগুলো হাতে পাওয়ার সময়ই দুর্বল ছিল, কেউ কেউ এক সপ্তাহের মধ্যেই মৃত্যুর কথা বলেছেন।

প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, বিতরণের আগে প্রতিটি ছাগলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পিপিআর টিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে ছাগল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ বা টিকাদানের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। কার্যাদেশের কপি হাতে পাওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে ছাগল বিতরণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন দাবি করেন, ‘বিতরণের সময় ছাগলগুলো সুস্থ-সবল ছিল। পরে পরিচর্যার ঘাটতি ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে মারা যেতে পারে।’

নগদ টাকা ও উপকরণেও ধোঁয়াশা;

প্রথম পর্যায়ে ১০০ উপকারভোগীকে আড়াই হাজার টাকা করে মোট আড়াই লাখ টাকা নগদ দেওয়ার কথা। কিন্তু এই অর্থ বিতরণের কোনো রসিদ, ভাউচার বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নথি পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর থোয়াইংনিং মার্মা বলেন, ‘বরাদ্দ পাওয়া যায়নি, তাই অর্থ বিতরণ করা হয়নি।’ অথচ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দাবি, সব অর্থ ও উপকরণ বিতরণ হয়েছে। দুই কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী এই বক্তব্য প্রশ্নকে আরও গভীর করেছে।

উপকরণের হিসাবেও গরমিল। প্রথম পর্যায়ে পাঁচটি করে ফ্লোর ম্যাট পাওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ উপকারভোগী তা পাননি। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫০ কেজি খাদ্যের জায়গায় কেউ কেউ পেয়েছেন মাত্র অর্ধেক। ২০০টি সিআই শিট ও ৪০০টি কংক্রিট পিলার বিতরণের নথি থাকলেও যাচাই করা উপকারভোগীদের বাড়িতে এসব দিয়ে গৃহনির্মাণের কোনো চিহ্ন মেলেনি।

এত কিছুর পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো এটি- বিতরণ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আগে অবহিত করার নিয়ম থাকলেও ফটিকছড়ির ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম ছাগল বিতরণের বিষয়টি জানতেনই না। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাকে অবহিত করা হয়নি। এটি দুঃখজনক।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর স্বীকার করেছেন ছাগল বিতরণ হয়েছে। তবে অনিয়মের দায় তিনি চাপিয়েছেন মাঠ কর্মকর্তার ওপর।

মায়ালক্ষ্মী ত্রিপুরার ছাগলটি মরে গেছে। সরকারি নথিতে তাঁর স্বাক্ষর আছে, যদিও তিনি করেননি। আড়াই হাজার টাকা পাওয়ার কথা, পাননি। ফ্লোর ম্যাট পাওয়ার কথা, মেলেনি। যে প্রকল্প তাঁর জীবন বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত শুধু কাগজেই রয়ে গেছে।

সরি, কপি করা যাচ্ছে না

Scroll to Top

কি খুজছেন ?