চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর থানাধীন পূর্ব ফটিকছড়ি দত্ত পাড়ার পশ্চিমের একটি আলপথ লাগোয়া গর্তের পানিতে ডুবে দুই কন্যা শিশু’র করুণ মৃত্যু হয়েছে। রোববার (৫ এপ্রিল) দিনের প্রথমভাগে হৃদয়বিদারক এই জোড়া প্রাণহানির দূর্ঘটনাটি ঘটেছে।
পিঠাপিঠি বয়সী ফুলের মতো দুই কন্যার নামেও দারুণ মিল। সাকি (৯) আর সানজিদা (৮)। তাদের এই সহমরণের দু:সহনীয় কাহিনীটি সারাদিন মনটাকে ভারী করে রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাশাপাশি গণমাধ্যমেও বেদনার ছাপ ছড়িয়েছে। অনেক মানুষ সমব্যথীতা প্রকাশ করেছেন। পেশাগত কারণে দুই দশকের বেশি সময় পাহাড়ে (খাগড়াছড়ি) বসবাস করলেও জন্মসূত্রে এবং কৈশোর-যৌবনের দিক থেকে সাকি আর সানজিদাদের বাড়ি আমার গ্রামের কাছাকাছি। কেন জানি, তাদের মৃত্যুর ভয়াবহতা আমাকেও ব্যথিত করেছে। অবচেতনে কাঁদিয়েছে। মনে হচ্ছে, ওরা যেনো আমার কোন স্বজনেরই পরম আদরের কন্যাশিশু।
সাকি-সানজিদা রোজকার নিয়মে মাদ্রাসায় যেতো, হয়তো বান্ধবীসুলভ শৈশবের মতো হাসতে-খেলতে-দুলতে দুলতে একসাথে একপথেই বাড়ি ফিরতো। সচরাচর গ্রাম এলাকায় শুকনো মৌসুমে সর্বসাধারণ হাঁটাপথ কমানোর জন্য মূলপথ এড়িয়ে বিলপথে-আলপথেই বেশি চলাচল করেন। ‘সাকি-সানজিদা’ও বয়সী স্বজনদের কাছ থেকে এটিই শিখেছেন। এবং সেই পথেই হয়তো একটু আগে বাড়ি ফেরার তাড়া করছিলো। আর শিশুমনের এই চঞ্চলতাই তাদের মা আর বাবাবাদের জন্য বয়ে নিয়ে আসলো বুকের গহীনে ছাইচাপা শোকের আগুন। যে আগুন আমৃত্যু নিভবে না! কেউ কি জানতো কোন এক নিষ্ঠুর মাটিখেকো এই পথের পাশেই বিশ ফুটের বেশি গভীর এক মৃত্যুখাদ পুঁতে রেখেছে!
বাংলাদেশের নদী-খালে-পুকুরে শিশু এবং সাঁতার না জানা মানুষের মৃত্যুর অনেক ঘটনাই ঘটে প্রতিনিয়িত। কিন্তু বেআইনীভাবে অসৎ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ধানীজমিতে যত্রতত্র গর্ত খুঁড়ে মাটি লোপাটের অনাচার এবং সেই অনাচারের বলি হবে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশুরা; এটা তো মানা যায় না। এবং এই অনাচারের সূতিকাগারে পরিণত হয়েছে ফটিকছড়ি উপজেলার পাইনন্দং-কাঞ্চননগর, হারুয়ালছড়ি, সুয়াবিল, ভূজপুর, নারায়ণহাট ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা। কয়েক দশক ধরে প্রায় বাধাহীনভাবেই এসব এলাকার ফসলের উর্বর ভূমি প্রাণ হারাচ্ছে। গভীর গর্তে পরিণত হচ্ছে। প্রশাসনের আপ্রাণ চেষ্টাতেও ঠেকানো যাচ্ছে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে হয়তো আর কয়েকবছর পর এসব এলাকার হাজার হাজার একর কৃষিজমি যেমন উর্বরা শক্তি হারিয়ে ফেলবে, কর্ম হারাবে হাজার হাজার কৃষিজীবি পরিবারও। তাই, ‘সাকি-সানজিদা’র মর্মন্তুদ মৃত্যুকে সামনে রেখে প্রশ্ন তুলতে চাই, ‘সব মৃত্যুই কি স্বাভাবিক, অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর দায় কি কেউ-ই নেবে না?
আসুন, এই দুই শিশুর সহমরণের ঘটনাটির একটু আদ্যপান্ত খুঁজি। ঈদে-পার্বণের বন্ধে শহর-নগরবাসী অনেকই গ্রামে ছুটে আসেন। পরিবারের শিশুরাও এই সময় প্রাণ খুলে ঘুড়ির মতন গ্রামজুড়ে ঘুরতে থাকে-খেলতে থাকে। যদি ‘সাকি-সানজিদা’র ঘটনাটি এমন কোন প্রভাবশালী পরিবারের ক্ষেত্রে ঘটতো; তাহলে কি আমরা এমন চুপচাপ থাকতে পারতাম, নিশ্চয়ই না।
বিধাতা না করুক, এমন ভয়াবহতার দু:স্বপ্ন কখন কার জীবনে নেমে আসে! তাই সময় থাকতে সবার স্বার্থে-মানবিক বিবেচনায় সব শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নে জেগে উঠার এখনই সময়। একটি উপজেলার একটি বিস্তীর্ণ জনপদের পরতে পরতে এমন মৃত্যুকূপগুলো গ্রাম ও পাড়া লেভেলে কমিটির মাধ্যমে চিহ্নিত হওয়া দরকার। পাড়ায় শিশু ও অভিভাবকদের মাঝে ইটভাটার প্রয়োজনে গড়ে উঠা কথিত দানবপুকুরের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা দরকার। এই ধরনের মৃত্যুকে প্ররোচনাজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করে নুন্যতম আইনি ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করা দরকার। এইসব গর্তপ্রবণ গ্রামগুলোর শিশুদেরকে সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নেয়াও জরুরী।
অন্তত: ‘সাকি-সানজিদা’র শোকাহত পরিবারের পাশে জনপ্রতিনিধি আর প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা গিয়ে একটু সহানুভূতি নিয়ে বলুক, ‘আমরা, আপনাদের পাশে আছি’। এই মৃত্যুকূপটি কারা করেছে, তাঁদের চিহ্নিত করে উল্লেখযোগ্য জরিমানার পথ খোঁজা যেতে পারে। যাতে বেআইনী এই লোভাতুর অন্যায্য ব্যবসার পথ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
পাঁচ শত আটত্রিশ শব্দের এই আকুতিতে কেউ ব্যক্তিগত আক্রমণবোধ করলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে দিনশেষে দুটো ফুলের মতো শিশুর জীবন কেড়ে নেয়ার অপরিণামদর্শী এই ব্যবসা যেনো আর কোন শিশুর জীবনহানির কারণ না হয়; সেজন্যই আমার এই নাতিদীর্ঘ বিনত বয়ান।



